ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩

তথ্য গোপন ও একগুঁয়েমি পিডির: ভেস্তে যাচ্ছে সরকারের বিপুল বিনিয়োগ

তথ্য গোপন ও একগুঁয়েমি পিডির: ভেস্তে যাচ্ছে সরকারের বিপুল বিনিয়োগ

খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ ‘কেবিএস’ প্রকল্পের ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র গোপন করে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. কামরুজ্জামানের একক সিদ্ধান্ত এবং একগুঁয়েমির কারণে ভেস্তে যেতে বসেছে সরকারের এই বিপুল বিনিয়োগ। তিন জেলার শতাধিক উন্নয়নকাজ অসম্পূর্ণ রেখে এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রকৌশলীদের মতামতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আগামী ৩০ জুনই প্রকল্প সমাপ্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে দায়সারাভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করে পিডি বলেন, “আমি এখানে থাকতে চাই না। প্রকল্পের মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না।” এরপরই তিনি ফোন কেটে দেন। এসব কারণে প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের মাঝে চরম ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিয়েছে।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তিন জেলার যোগাযোগব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং গ্রামীণ অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধির মহাপরিকল্পনা নিয়ে ২০১৬ সালে কেবিএস (খুলনা-বাগেরহাট-সাতক্ষীরা) প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। নির্ধারিত মেয়াদে কাজ শেষ করতে না পারায় পরবর্তীতে প্রকল্পটির মেয়াদ এক দফা বৃদ্ধি করা হয়েছিল। সেই বর্ধিত মেয়াদও আগামী ৩০ জুন শেষ হতে চলেছে।

অথচ মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। তিন জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এখনও অসংখ্য সড়ক, সেতু ও কালভার্টের নির্মাণকাজ মাঝপথে আটকে আছে। কোথাও পিচ ঢালাইয়ের জন্য সড়ক খনন করে মাসের পর মাস ফেলে রাখা হয়েছে, কোথাও সেতুর পিলার বা স্প্যান অর্ধেক তৈরি হয়ে থমকে আছে, আবার কোথাও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো নির্মাণসামগ্রী ফেলে রেখে কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। সামনেই বর্ষা মৌসুম শুরু হতে চলায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মনে তীব্র আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, এই বর্ষার আগে অসম্পূর্ণ কাজগুলো শেষ না হলে তিন জেলার মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে।

প্রকল্প কার্যালয় ও মাঠপর্যায়ের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা গেছে, প্রকল্প পরিচালক মো. কামরুজ্জামান পরিকল্পনা কমিশন ও পিএসসি (প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি) সভায় বাস্তব তথ্য আড়াল করেছেন। তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি করেছেন, প্রকল্পে মাত্র ১৬টি স্কিমের কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে এবং আগামী জুনের মধ্যেই সেগুলোর কাজ শেষ করা সম্ভব।

অথচ তিন জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীদের পাঠানো দাপ্তরিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাস্তবে এখনও প্রায় শতাধিক স্কিমের কাজ চলমান বা অসম্পূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

খুলনা জেলা: জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকল্প পরিচালকের কাছে লিখিত চিঠি পাঠিয়ে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, তার জেলার অন্তত ১৩টি স্কিমের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

সাতক্ষীরা জেলা: এই জেলা থেকে প্রায় অর্ধশতাধিক চলমান স্কিমের ধীরগতি ও অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে, যা জুনের মধ্যে শেষ হওয়া অসম্ভব।

বাগেরহাট জেলা: বাগেরহাটের মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলীরাও একই ধরনের উদ্বেগজনক ও অসম্পূর্ণ কাজের প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন।

মাঠপর্যায়ের এই বাস্তবভিত্তিক ও সত্য তথ্যগুলোকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে প্রকল্প পরিচালক পিএসসি সভায় মনগড়া ও সীমিত তথ্য উপস্থাপন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে সরকারের নীতিপ্রণেতাদের কাছে প্রকল্পের প্রকৃত চিত্র আড়াল করা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, প্রকল্প পরিচালক শুরু থেকেই একনায়কতান্ত্রিকভাবে সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। তিনি মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা অংশীজনদের কোনো মতামত বা পরামর্শকে তোয়াক্কাই করছেন না।

এক কর্মকর্তা বলেন, “মাঠের বাস্তব পরিস্থিতি এবং পিডির উপস্থাপিত তথ্যের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। এই চরম সমন্বয়হীনতার কারণে অনেক স্কিমে কাজের গতি কমে গেছে এবং ঠিকাদাররা দিক হারিয়ে ফেলেছেন।” অন্য এক কর্মকর্তা জানান, প্রকল্প পরিচালক শুরু থেকেই কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই প্রকল্পের মেয়াদ আর না বাড়ানোর পক্ষে জেদ ধরে আছেন। ফলে এখন ঠিকাদার ও প্রকৌশলীরা এক ধরণের মানসিক ও প্রশাসনিক চাপের মধ্যে কাজ করছেন, যা কাজের গুণগত মানকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়েও পিডির বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। আগামী অর্থবছরের জন্য এই প্রকল্পে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও, পিডি সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূতভাবে তার নিজ জেলা কুষ্টিয়ার একটি প্রকল্পে ২০ কোটি টাকা স্থানান্তর করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে কেবিএস প্রকল্পের চলমান স্কিমগুলো চরম অর্থসংকটে পড়েছে এবং ঠিকাদারদের বকেয়া বিল পরিশোধ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে।

এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্যরা। চলমান কাজগুলো সুষ্ঠুভাবে শেষ করার জন্য প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর দাবি জানিয়ে সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ইজ্জত উল্ল্যাহ প্রধান প্রকৌশলীর কাছে একটি আধা-সরকারি (ডিও) পত্র পাঠিয়েছেন। পত্রে তিনি চলমান স্কিমগুলো সম্পন্ন করতে প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করার জোর দাবি জানান। একই ধরনের চিঠি দিয়েছেন খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্যও। তাদের স্পষ্ট বক্তব্য—অসম্পূর্ণ কাজ রেখে তড়িঘড়ি করে প্রকল্প শেষ করা হলে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম জনগণের কাছে প্রশ্নের মুখে পড়বে এবং বিপুল অর্থ অপচয় হবে।

প্রধান প্রকৌশলী সংসদ সদস্যদের এই সুপারিশগুলো বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পরিকল্পনা কমিশন ও প্রকল্প পরিচালকের কাছে পাঠালেও পিডি কামরুজ্জামান এসবের কোনো গুরুত্বই দিচ্ছেন না।

চলমান স্কিমের ঠিকাদাররা বর্তমানে চরম অনশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এক ঠিকাদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সময়ের তুলনায় এখনও বিপুল কাজ বাকি। কাজ শেষ না হলে আমরা বিল পাব কি না, প্রশাসনিক কোনো জটিলতা হবে কি না—তা নিয়ে আতঙ্কে আছি। পিডির অফিসে গেলে সমাধানের বদলে উল্টো চাপ দেওয়া হয়।”

অন্য এক ঠিকাদার জানান, জুনের সময়সীমা ধরার জন্য অনেক জায়গায় অতিরিক্ত শ্রমিক ও যন্ত্রপাতি দিয়ে জোরপূর্বক কাজের গতি বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, কিন্তু এত অল্প সময়ে কোনোভাবেই মানসম্মত টেকসই কাজ করা সম্ভব নয়।

সাতক্ষীরার নির্বাহী প্রকৌশলী তারিকুল হাসান এবং খুলনার নির্বাহী প্রকৌশলী যৌথভাবে স্বীকার করেছেন যে, বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় মেয়াদ না বাড়ালে সরকারের এই বিশাল উন্নয়ন উদ্যোগ অধরাই থেকে যাবে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের এই মেগা প্রকল্পের কাজ অসম্পূর্ণ রেখে সমাপ্ত ঘোষণা করা হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তিন জেলার লাখ লাখ মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হবে।